
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত—৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এক জটিল ও সংবেদনশীল রেখা। এই সীমান্ত কেবল ভৌগোলিক বিভাজন নয়, এটি একদিকে দুই দেশের মানুষের আবেগ, সম্পর্ক ও ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত, অন্যদিকে ভারতের নিরাপত্তা, কূটনীতি ও অর্থনীতির ওপর প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলছে। ভারতবর্ষের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের পাঁচটি রাজ্য—পশ্চিমবঙ্গ, অসম, মেঘালয়, ত্রিপুরা এবং মিজোরাম—এই দীর্ঘ সীমান্তের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। কিন্তু আজকের বড় প্রশ্ন সীমান্তের পুরো অংশে কেন এখনও কাঁটাতার দেওয়া হয়নি? কেন এখনও প্রায় ৪০০ কিমি সীমান্ত অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে? সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বহুবার দেওয়া হলেও বাস্তবের চিত্র বলছে অন্য কথা। বাংলাদেশে যখন রাজনৈতিক অস্থিরতা, উগ্রপন্থার মাথাচাড়া দেওয়া, জাল নোট ও মাদক পাচারের প্রসার দেখা দিচ্ছে, তখন ভারতের নিরাপত্তার প্রশ্ন আরও তীব্র হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সীমান্ত সুরক্ষায় গড়িমসি মানে কেবল নিরাপত্তার ফাঁক রাখা নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্বকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া। আজকের এই প্রতিবেদনে আমরা আলোচনা করব এই সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম আন্তর্জাতিক সীমান্ত। এর দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬ কিলোমিটার, যা ভারতের পূর্ব ও উত্তর-পূর্বের পাঁচটি রাজ্যে বিস্তৃত। সবচেয়ে দীর্ঘ সীমান্ত পশ্চিমবঙ্গের, যা ২,২১৭ কিমি। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক সীমান্ত কেবলমাত্র পশ্চিমবঙ্গেই। এর পরেই রয়েছে ত্রিপুরা—৮৫৬ কিমি, তারপর মেঘালয়—৪৪৩ কিমি, মিজোরাম—৩১৮ কিমি এবং অসম—২৬৩ কিমি। এই দীর্ঘ সীমান্ত কেবল সংখ্যা নয়, প্রতিটি রাজ্যের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য আলাদা। পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তে নদী, বনাঞ্চল, গ্রামীণ জনপদ; ত্রিপুরার সীমান্তে পাহাড়ি অঞ্চল; আর মিজোরামের সীমান্ত প্রায় দুর্গম অরণ্যের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। ফলে প্রতিটি অঞ্চলে সীমান্তরক্ষার কৌশলও আলাদা হতে বাধ্য। পশ্চিমবঙ্গ ও অসমের সীমান্ত দিয়েই সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশ, পাচার ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কারণ, এই দুই রাজ্যের সীমান্তে ঘনবসতি, গ্রামীণ বাজার, চাষের জমি ও নদীপথ একে নিরাপত্তার দিক থেকে আরও দুর্বল করে তুলেছে।
সরকারি হিসাব বলছে, প্রায় ৯০ শতাংশ সীমান্তে কাঁটাতার বসানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল বাকি অংশে—প্রায় ৪০০ কিমি সীমান্ত এখনও খোলা। এই অরক্ষিত অংশের বড় অংশ পশ্চিমবঙ্গ ও অসমে। বিশেষত, পশ্চিমবঙ্গের মালদা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, কুঁচবিহার ও উত্তর দিনাজপুর জেলার সীমান্তে নদীপথ রয়েছে। নদীর ভেতরে কাঁটাতার দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে নদী পারাপার করেই প্রতিদিন অনুপ্রবেশ ঘটছে। একই অবস্থা অসমের ধুবরি জেলায়। ২০১৪ সালে সীমান্ত সুরক্ষা প্রকল্পে ঘোষণা হয়েছিল যে, ২০১৮ সালের মধ্যে পুরো সীমান্তে কাঁটাতার বসানো হবে। কিন্তু ২০২৫ এসে গেলেও এখনও তা বাস্তব হয়নি। এ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধী দল থেকে শুরু করে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরাও।
প্রথম কারণ—ভৌগোলিক জটিলতা। নদী, জলাভূমি, চরের ভেতরে কাঁটাতার বসানো প্রযুক্তিগতভাবে প্রায় অসম্ভব। প্রতি বর্ষায় নদীর গতিপথ বদলায়, জমি ভাঙে, ফলে স্থায়ী কাঠামো দাঁড় করানো যায় না। দ্বিতীয় কারণ—ভূমি অধিগ্রহণ সমস্যা। অনেক গ্রাম সীমান্তের একেবারে কাছে, যাদের জমি কাঁটাতারের ভেতরে চলে যায়। তারা জমি ছাড়তে রাজি নয়। তৃতীয় কারণ—আন্তর্জাতিক চুক্তি। ভারত ও বাংলাদেশের চুক্তি অনুযায়ী কাঁটাতার আসল সীমান্ত থেকে ১৫০ গজ ভেতরে বসাতে হয়। ফলে অনেক গ্রাম মাঝখানে পড়ে যায়, যেটা মানুষের জীবনযাত্রায় সমস্যা তৈরি করছে। চতুর্থ কারণ— রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব। বহুবার বাজেটে বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও কাজের গতি খুব ধীর। ফলে সীমান্ত সুরক্ষার প্রশ্নে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত ও প্রশাসনিক জটিলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সঙ্কট, এবং উগ্রপন্থী সংগঠনের পুনরুত্থান ভারতের জন্য উদ্বেগের কারণ। পাচারচক্র, জাল নোট চক্র, গরু পাচারকারী—সকলেই এই অরক্ষিত সীমান্ত ব্যবহার করছে। ২০১৯ সালে এনআইএ-র রিপোর্টে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ সীমান্ত দিয়েই সবচেয়ে বেশি জাল নোট ভারতে প্রবেশ করছে। এছাড়া ইয়াবা নামক মাদক ট্যাবলেটের বড় অংশও এভাবেই আসে। এমনকি গোয়েন্দা সূত্র বলছে, সীমান্ত খোলা থাকলে শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারীর ঢল নামতে পারে, যা ভারতের জনসংখ্যার ভারসাম্য, অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা —সব ক্ষেত্রেই বড় চাপ তৈরি করবে।
সরকার দাবি করছে, এখন স্মার্ট ফেন্সিং, সেন্সর-ভিত্তিক নজরদারি, ড্রোন ব্যবহার ও লেজার ওয়াল বসানো হচ্ছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রকল্প কেবল কাগজে আছে, মাটিতে তার প্রমাণ নেই। বিরোধী দল অভিযোগ তুলছে সীমান্ত সুরক্ষা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার রাজনৈতিক বক্তৃতা দেয়, কিন্তু বাস্তবে কাজের গতি অত্যন্ত ধীর। এমনকি বাজেটে বরাদ্দ হওয়া অর্থও পুরোপুরি খরচ হয়নি।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত শুধু একটি আন্তর্জাতিক সীমারেখা নয়, এটি ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জনতাত্ত্বিক ভারসাম্যের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। আজ যখন সীমান্তের বড় অংশ কাঁটাতারবিহীন অবস্থায় রয়েছে, তখন এর সুযোগ নিচ্ছে পাচারচক্র, অনুপ্রবেশকারী এবং অপরাধী নেটওয়ার্ক। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি ভারতের জন্য আরও বড় সতর্কবার্তা। তাই প্রশ্নটা খুব সোজা—ভারত কি এখনও সময় নষ্ট করার মতো অবস্থায় আছে?সীমান্তে গড়িমসি মানে দেশের নিরাপত্তা ফাঁকা রাখা। এখন জরুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ, এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার। না হলে সীমান্ত সুরক্ষার এই ফাঁক ভবিষ্যতে ভারতের জন্য ভয়ঙ্কর বিপদ ডেকে আনতে পারে।





