ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতীক বড় কাঁছারির মন্দিরে ছুঁয়ে দেখুন অতীতের গৌরব

ধর্মের প্রতি মানুষের সে এক অগাধ বিশ্বাস, তাই ভারতবর্ষের চারিদিকে ছড়িয়ে রয়েছে নানান তীর্থ স্থান। শুধু আজ বলে নয়, ভগবানের প্রতি বিশ্বাস, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা বহু যুগ ধরে চলে আসছে সেই একই ভাবে। আর সেই ধর্ম সৃষ্টি হয়েছে ভারতের বহু মন্দিরের বুকে। তেমনই একটি মন্দির রয়েছে এই বাংলার বুকে যা বাবা বড় কাঁছারি নামে সকলের কাছে পরিচিত।
তেত্রিশ কোটি দেবতার মধ্যে দেবাদিদেব মহাদেব হল সৃষ্টি স্থিতি ও প্রলয়ের আরো এক রূপ। প্রতি বৎসর শ্রাবন মাসে হাজার হাজার শিবভক্ত বড় কাঁছারির মন্দির প্রাঙ্গনে বাবা মহাদেবের মাথায় জল ঢালতে যান। হিন্দু-মুসলিমসহ সব ধর্মের মানুষ এখানে আসেন পুজো দিতে। তাই বর্তমানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য এক নজির হয়ে উঠেছে বড় কাঁছারি। লোকমুখে শোনা যায় যে এই মন্দিরে যে কেউ মানত করে পুজো দিলেই নাকি সেই সব মনষ্কামনা পূরণ হবেই। ২৫০ বছরেরও পুরানো বাবা বড় কাঁছারি মহিমা শুনলে এখনও সবার মন শিউরে ওঠে।

বড় কাঁছারি কথাটির অর্থ হল বড় কোর্ট। অনেকে আবার এই স্থানকে ভুতের কাছারিও বলে থাকেন। এখানে শিব ভূতনাথ অর্থাৎ ভূত-প্রেতের দেবতা বলে পরিচিত। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় এক প্রত্যন্ত গ্রামে অবস্থিত এই মন্দিরের ইতিহাস বড়ই অলৌকিক।
নিঃসন্তানদের সন্তান লাভের ইচ্ছা পূরণ করার জন্য এই মন্দির বিখ্যাত। এছাড়া বহু পূণ্যার্থীরা অসুখ, প্রেমে বাধা, জমিজমা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান এখানে লোকে পূজা দিতে আসেন। ভক্তদের সন্তান লাভের বাসনা পূরণ হলে, পুকুরে স্নান করে গন্ডি কেটে পুজো দেন। ছেলে হলে মাটির গোপাল, আর মেয়ে হলে দিতে হয় একটা মাটির সখী। আবার অনেকে জোড়া গোপাল বা সখী ও দিয়ে থাকেন। মঙ্গল ও শনিবার সব থেকে বেশি ভিড় দেখতে পাওয়া যায় এই মন্দিরে। এখন অবশ্য প্রতিটা দিনই সেই ভিড় দেখা যাচ্ছে। এছাড়াও এই মন্দিরে নীল পুজোর সময় ও শ্রাবণ মাসে বেশি ভিড় হয়। ভক্তরা তাদের মনের বাসনা কাগজে লিখে মন্দিরটির সামনের রেলিংয়ে লাল দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখেন। এখানের প্রসাদ হল বাতাসা আর চিনির রঙিন খেলনা।
বড় কাছারির কোনও লিখিত ইতিহাস পাওয়া যায় নি। তবে জনশ্রুতি আছে যে নবাব আলীবর্দী খাঁ শাসনকালের শেষের দিকে মারাঠা বর্গীরা বাংলা আক্রমণ করেছিল। তাদের অত্যাচারের হাত থেকে বাঁচতে স্থানীয় লোকজন কাছের একটি জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। এই জঙ্গলটি আদপে ছিল একটি শ্মশান। মারাঠা বর্গীরা এই জঙ্গলে ভুতের ভয়ে প্রবেশ করত না। কিছুদিন পরে এই শ্মশানে আসেন এক সাধু। তিনি তার অলৌকিক ক্ষমতাবলে, গ্রামের লোকজনদের সমস্যা এবং শারীরিক অসুস্থতা সারিয়ে দেন। এরপর কয়েক বছর পর, মারাঠাদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীকালে সাধুর মৃত্যুর পর পর এখানেই তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই তার কবরে থেকে একটি অশ্বত্থ গাছ গজিয়ে ওঠে। সবার বিশ্বাস হয়, সাধু বাবা শিবের অংশ ছিলেন এবং মৃত্যুর পরেও এই অশ্বত্থ গাছের রূপে, তিনি সব গ্রামবাসীকে রক্ষা করার জন্য ফিরে এসেছেন। এরপর থেকেই এই জায়গাটি ভূতনাথের কাছারি নামে পরিচিত হয়।





