কৃত্রিম শুক্রাণু ঘোচাবে বন্ধ্যত্ব! জনন কোষ তৈরি হচ্ছে গবেষণাগারে

মানুষ কি কেবল সন্তান ধরণের জন্যই একে অপরের সাথে ঘর বাঁধে, নাকি ভালোবাসাই থাকে এই সম্পর্কের সমীকরণের মূল মন্ত্র!কোনটা?
সন্তান জন্মের জন্য প্রয়োজন একজন পুরুষ, একজন নারী এবং প্রকৃতির ইচ্ছা। কিন্তু বিজ্ঞান ক্রমশ সেই প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য ভবিষ্যতে আদৌ কি একজন পুরুষের প্রয়োজন পড়বে? এমন প্রশ্নের জবাব আজ আর শুধু ভাবনার স্তরে সীমাবদ্ধ নয়, গবেষণাগারে তার নিরীক্ষা শুরু হয়ে গিয়েছে বহু আগেই। আর এই নিরীক্ষার ফলাফল সামনে আসতেই বিজ্ঞানীরা আশাবাদী—সন্তান জন্মের ছবিটা আগামী দিনে একেবারে পাল্টে যেতে চলেছে।
জাপান, চিন এবং আমেরিকার মতো দেশগুলির গবেষকরা এখন পরীক্ষামূলকভাবে ‘ইন ভিট্রো গ্যামেটোজেনেসিস’ নামে এক প্রযুক্তির সাহায্যে কৃত্রিমভাবে শুক্রাণু ও ডিম্বাণু তৈরির পথে অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছেন। এই পদ্ধতির মূল উদ্দেশ্য, এমন সব মানুষদের সাহায্য করা যাঁরা কোনও কারণে সন্তান ধারণে অক্ষম—হয় জিনগত কারণে, নয়তো চিকিৎসাজনিত সমস্যায়। শুধু তাই নয়, সমলিঙ্গ দম্পতিদের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে কার্যকরী হতে পারে বলে দাবি গবেষকদের।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিনে ইতিমধ্যেই ইঁদুরের দেহে সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে। গবেষণাগারে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর নিষেকে জন্ম নিয়েছে সম্পূর্ণ সুস্থ ইঁদুরছানা। অর্থাৎ, কোনও পুরুষ ইঁদুরের শরীর থেকে সংগৃহীত প্রকৃত শুক্রাণুর দরকার পড়েনি—নতুন প্রাণ এসেছে শুধুই গবেষণাগারের কাঁচের ঘরে জন্ম নেওয়া কোষের সাহায্যে। এটি নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী সাফল্য।
এই কৃত্রিম জনন কোষ তৈরির পেছনে মূল ভূমিকা নিচ্ছে স্টেম সেল বা মাতৃকোষ। এটি এমন এক ধরনের আদি কোষ, যেখান থেকে তৈরি হতে পারে শরীরের যেকোনো ধরনের কোষ—হোক তা রক্তের, যকৃতের কিংবা ডিম্বাণু বা শুক্রাণুর। গবেষকেরা প্লুরিপোটেন্ট স্টেম সেলকে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় প্রাইমরডিয়াল জার্ম সেলে রূপান্তর করছেন, যেখান থেকে জনন কোষ উৎপন্ন হয়। স্টেম সেলের এই পরিবর্তনই ভবিষ্যতে প্রজননশক্তিহীন মানুষদের জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে নতুন আশার আলো।
দুটি পথেই এখন এই কোষ সংগৃহীত হচ্ছে—এক, ভ্রূণের কোষ থেকে সংগৃহীত এমব্রায়োনিক স্টেম সেল এবং দুই, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহকোষ থেকে তৈরি ইনডিউসড প্লুরিপোটেন্ট সেল। গবেষণাগারে একাধিক ধাপে এই কোষগুলিকে এমনভাবে পরিণত করা হচ্ছে, যাতে তারা শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর মতো আচরণ করতে পারে। আর সেই কোষ দিয়েই ভবিষ্যতে হতে পারে নিষেক, যার ফলে জন্ম নিতে পারে এক নতুন প্রাণ।
তবে এখনো পর্যন্ত এই পদ্ধতি শুধুমাত্র প্রাণীদেহেই সফল হয়েছে। মানবদেহে প্রয়োগ করার আগে বহু নিয়ম-কানুন, নিরাপত্তা এবং নীতিগত প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়াবে, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছে। অনেকেই এই প্রযুক্তিকে স্বাগত জানালেও, অনেক গবেষক আবার আশঙ্কা করছেন—এই পদ্ধতির অপব্যবহার হলে ভবিষ্যতে ‘ডিজাইনড বেবি’-র যুগ চলে আসতে পারে, যেখানে শুধু সন্তান নয়, সন্তানের গঠন, বর্ণ, বুদ্ধিমত্তাও বিজ্ঞান দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
তবুও বিজ্ঞানীরা আশাবাদী। তাঁদের বক্তব্য, এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য শুধুই মানবিক—সন্তানহীন দম্পতির মুখে হাসি ফোটানো এবং প্রজননের অধিকারকে আরও সমান ও সার্বজনীন করে তোলা। এমনকি ভবিষ্যতে যদি কোনও ব্যক্তি একা থাকেন, অথবা বয়সজনিত কারণে সন্তান ধারণ সম্ভব না হয়, তবুও এই পদ্ধতির সাহায্যে তাঁরা বাবা বা মা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন।
বর্তমানে যেখানে আইভিএফ পদ্ধতি বহু ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হচ্ছে, সেখানে স্টেম সেল নির্ভর এই নতুন কৌশল আগামী দিনে প্রজননের পরিভাষা বদলে দিতে পারে বলেই মত চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের একাংশের।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সন্তান জন্মের যে ছক আমাদের সমাজ এতদিন মেনে এসেছে, সেই ছকটাই বদলে যেতে বসেছে। পুরুষ বা নারী নয়, ভবিষ্যতের জনন ক্ষমতা হয়তো শুধুই কোষ আর প্রযুক্তির উপর নির্ভর করবে। এই মুহূর্তে বিষয়টি পরীক্ষামূলক হলেও, বিজ্ঞানীদের দাবি সত্যি হলে তা আগামী প্রজন্মের জীবনে এক আমূল পরিবর্তন এনে দেবে। আর সেই ভবিষ্যতের কড়া নাড়ছে আজকের গবেষণাগারেই।





