Breaking NewsPOLITICSআরও ≡দেশলাইফস্টাইল

যোগীরাজ্যে পাঠ্যবই থেকে বাদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা! তবে কি ভয় পাচ্ছে গেরুয়া শিবির

বুধবার রাজ্যসভায় একটি প্রশ্ন, আর সেখান থেকেই শুরু হলো তীব্র বিতর্ক। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করলেন—“উত্তরপ্রদেশ বোর্ড অফ এডুকেশন কি দ্বাদশ শ্রেণির পাঠ্যবই থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বাদ দিয়েছে?” প্রশ্নটি ছিল একেবারেই সরল। এর উত্তর হতে পারত মাত্র দুটি শব্দ—হ্যাঁ অথবা না। কিন্তু কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত চৌধুরী সরাসরি উত্তর না দিয়ে ঘুরিয়ে দিলেন। তাঁর বক্তব্য—“কোন লেখা অন্তর্ভুক্ত হবে আর কোন লেখা বাদ যাবে, সেটা রাজ্যের শিক্ষা বোর্ড ঠিক করে।” অর্থাৎ, কেন্দ্র বলছে—এই বিষয়ে তাদের কোনও দায়িত্ব নেই। অথচ এ প্রশ্নের উত্তর যেদিকে যাক, তা ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।কারণ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু বাংলার কবি নন, তিনি ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম নোবেলজয়ী। তাঁর কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ—সব মিলিয়ে তিনি ভারতীয় সাহিত্য-সংস্কৃতির সর্বজনীন প্রতীক।তাহলে কেন তাঁকে পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠছে? কেন কেন্দ্র সরাসরি বলছে না—“হ্যাঁ, তিনি আছেন” অথবা “না, তিনি নেই”? বিরোধীরা বলছেন—এই উত্তর আসলে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’। সরাসরি জবাব না দিয়ে দায় এড়িয়ে গেল কেন্দ্র। ফলে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

প্রশ্নের উত্তর হাতে পাওয়ার পরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর বক্তব্য—“আমি তো শুধু জানতে চেয়েছিলাম, রবীন্দ্রনাথের লেখা বাদ গেছে কি যায়নি। অথচ কেন্দ্র বলছে, উত্তরপ্রদেশ জানে, আমরা জানি না। এটা কীভাবে সম্ভব?” তিনি বলেন—“এখানে তো ডবল ইঞ্জিন সরকার চলছে। দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির কেন্দ্রীয় সরকার, উত্তরপ্রদেশে যোগী আদিত্যনাথের সরকার। তাহলে কেন্দ্র জানবে না, এটা কীভাবে সম্ভব?”এরপরই ঋতব্রত কড়া ভাষায় কটাক্ষ করেন—“বিজেপি রবীন্দ্রনাথকে ভয় পায়। সারা বিশ্ব যাঁর সামনে মাথা নত করেছিল, সেই রবীন্দ্রনাথকে পাঠ্যবই থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে তারা।” তিনি আরও দাবি করেন—“এটা নিছক পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন নয়। এটা আসলে বাংলা ও বাঙালির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।” এই বক্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। বিরোধীদের দাবি, বিজেপি রাজ্যগুলিতে পরিকল্পনা করেই রবীন্দ্রনাথের লেখা বাদ দিচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই আলোড়ন তুলছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ কেবল একজন কবি নন। তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের প্রথম নোবেলজয়ী। তাঁর লেখা ‘গীতাঞ্জলি’ শুধু বাংলা সাহিত্যের নয়, বিশ্বসাহিত্যের এক অমূল্য সম্পদ। তাঁর কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নাটক, সংগীত—সব মিলিয়ে তিনি ভারতের চিন্তাধারাকে গড়ে তুলেছিলেন নতুন করে।তাঁর লেখা জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ আজ ভারতের পরিচয় বহন করছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা’-ও তাঁর সৃষ্টি। অর্থাৎ, ভারতীয় উপমহাদেশে জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ।এমন একজন বিশ্বমানের সাহিত্যিকের লেখা যদি পাঠ্যবই থেকে বাদ যায়, তবে এর মানে দাঁড়ায়—ভারতের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তাঁকে চেনার সুযোগ হারাবে। তাঁকে জানার পথ বন্ধ হয়ে যাবে।অতএব, বিরোধীদের বক্তব্য—এটা নিছক একটা কবিতা বাদ দেওয়া নয়, বরং ভারতের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকেই বাদ দেওয়ার চেষ্টা।

শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে বিজেপির বিরুদ্ধে এর আগেও অভিযোগ উঠেছে।ইতিহাসে একাধিক অধ্যায় বাদ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে মুঘলদের ইতিহাসকে কম গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট। এমনকি বিজ্ঞানীদের অবদান নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। পাঠ্যক্রম থেকে বারবার বাদ দেওয়া হয়েছে নানা অধ্যায়, নানা তথ্য।এবার সেই তালিকায় যদি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম যুক্ত হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে আরও বিস্ফোরক হবে।বিরোধীদের মতে, এটা আসলে শিক্ষার গৈরিকীকরণ। শিক্ষার্থীদের সামনে একপেশে ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা। ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে সরিয়ে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ভাবধারা চাপিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ। তাদের বক্তব্য—“এটা কেবল একজন কবির লেখা বাদ দেওয়া নয়, এটা ভারতের বৈচিত্র্য মুছে দেওয়ার চেষ্টা।”

প্রশ্নটা এখন শুধু রবীন্দ্রনাথকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্নটা হলো—ভারতের শিক্ষা কোন পথে যাচ্ছে?যদি রাজনৈতিক কারণে পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হয় ইতিহাস, সাহিত্য বা সংস্কৃতির স্তম্ভদের, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কীভাবে জানবে তাদের নিজেদের শিকড়?রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বমানের সাহিত্যিককে বাদ দেওয়া মানে ছাত্রছাত্রীদের সামনে এক অন্ধকার তৈরি করা। তারা আর জানবে না, কেমন করে একজন ভারতীয় সাহিত্যিক সমগ্র পৃথিবীকে প্রভাবিত করেছিলেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন—এভাবে পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া মানে এক নতুন প্রজন্মকে তৈরি করা, যারা জানবে না ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি, জানবে না রবীন্দ্রনাথ, জানবে না বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য।ফলত, শিক্ষা হবে একপেশে। আর বহুত্ববাদী সমাজের ভিত ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।

আজকের বিতর্কের কেন্দ্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। একজন সাহিত্যিক, একজন দার্শনিক, একজন চিন্তাবিদ, একজন সংগীত স্রষ্টা—যিনি ভারতকে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছিলেন।যদি সত্যিই তাঁকে পাঠ্যবই থেকে বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেটা নিছক পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন নয়, বরং ভারতের সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা।কেন্দ্র বলছে, রাজ্যের বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু বিরোধীদের প্রশ্ন—“কেন্দ্রের নীরবতা কেন? রবীন্দ্রনাথ বাদ গেছেন কি যাননি, সেটা বলা কি এত কঠিন?” আজকের দিনে ভারতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রাজনীতি যেন শিক্ষা নিয়ন্ত্রণ না করে। শিক্ষা যদি সত্যিই আলোর পথ হয়, তবে সেই পথে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা কেবল অন্ধকারই বাড়াবে। শেষ প্রশ্নটা তাই থেকেই যায়— ভারতের তরুণ প্রজন্ম কি রবীন্দ্রনাথকে চিনবে, জানবে, বুঝবে? নাকি রাজনীতির চাপে ধীরে ধীরে ইতিহাস থেকে মুছে যাবে তাঁর নাম?যদি দ্বিতীয়টা ঘটে, তবে ভারতের ইতিহাস, ভারতের সাহিত্য, ভারতের আত্মাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বাদ দেওয়া যায় না। তাঁকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা মানে ভারতের আত্মাকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা। আর ইতিহাস কখনও ক্ষমা করবে না এমন প্রচেষ্টা।

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button